বাংলাদেশে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাবের জায়গায় নতুন কূটনৈতিক ভারসাম্যের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ ড্যানিলোভিচ। তার মতে, বাংলাদেশ এখন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দ্য ডেল্টাগ্রাম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থান, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা এই সাবেক মার্কিন কূটনীতিক।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন বাস্তবতা
শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর ভারতের অবস্থান এবং তাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ড্যানিলোভিচ বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত ইতিহাস ও ভূগোলের কারণে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তিনি বলেন, দুই দেশের সরকারই সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ধীরে ও ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে।
জন ড্যানিলোভিচ বলেন, "বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবের দিন এখন স্পষ্টতই শেষ।"
তার মতে, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের ভাবমূর্তির পরিবর্তনকেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ভারতের জনমতকেও প্রভাবিত করেছে।
চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা
বাংলাদেশকে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত করার আলোচনা প্রসঙ্গে ড্যানিলোভিচ বলেন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তার মতে, চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ উৎস ও বড় বাজার হতে পারে। পাশাপাশি মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরলে দেশটির সঙ্গেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, দক্ষ কূটনীতি পরিচালনা করতে পারলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে বাধা তৈরি করবে না।
রোহিঙ্গা সংকট ও রাখাইন করিডোর
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর প্রসঙ্গে ড্যানিলোভিচ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা কঠিন।
তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তার মতে, মানবিক করিডোর নিয়ে অনেক সমালোচনা ভুল তথ্য ও ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
আসিয়ান ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ড্যানিলোভিচ বলেন, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে হবে।
তিনি বলেন, আসিয়ান এবং ডি-৮ জোটের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেও উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান ড্যানিলোভিচ। তার মতে, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জন এফ ড্যানিলোভিচ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কূটনীতিক। তিনি বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসে উপপ্রধান মিশন কর্মকর্তা (Deputy Chief of Mission), দক্ষিণ সুদানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত এবং পাকিস্তানের পেশোয়ারে কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সূত্র: দ্য ডেল্টাগ্রাম