উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
উপকূলের বড় অংশ নিষিদ্ধ, কোথাও দূষিত পানি—অবশিষ্ট সৈকতে ভিড় করছেন হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষ
গাজার পশ্চিম উপকূলে হাজার হাজার তাঁবুর সারি। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন এসব অস্থায়ী তাঁবুতে। গরমে অসহনীয় তাপ, শীতে ঠান্ডা ও বৃষ্টির কষ্ট, নেই পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ—এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তাদের জন্য একমাত্র স্বস্তির জায়গা হয়ে আছে ভূমধ্যসাগর।
এক গাজাবাসী বলেন, “যুদ্ধ আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, আমাদের আনন্দও কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সমুদ্রকে কেড়ে নিতে পারেনি। এটি এখনো আমাদের শেষ আনন্দের জায়গা।”
গাজার মানুষের কাছে সমুদ্র শুধু পানির বিশাল অংশ নয়, এটি স্মৃতি, শৈশব ও বেঁচে থাকার প্রতীক। অনেকের জীবনের সুখের মুহূর্তগুলো জড়িয়ে আছে এই সমুদ্রকে ঘিরে।
এক চিকিৎসক স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় ফজরের নামাজের পর সাইকেল নিয়ে সমুদ্রে যেতাম। সাঁতার কেটে আবার বাড়ি ফিরে স্কুলে যাওয়ার আগে একটু বিশ্রাম নিতাম। এটি ছিল আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
গাজার উপকূলজুড়ে নিয়মিত টহল দেয় ইসরায়েলি নৌযান। জেলেদের জন্য নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলেরা বলছেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে তারা পর্যাপ্ত মাছ ধরতে পারছেন না।
স্থানীয় এক চিকিৎসক জানান, তিনি একবার একজন জেলের সঙ্গে সমুদ্রে গিয়েছিলেন। জেলেরা ভোরে বের হন, জাল ফেলেন এবং অনেক সময় ২৪ ঘণ্টা পর ফিরে আসেন। তাদের ধারণা, দিনের আলো বাড়লে নৌযানে হামলার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
উপকূলের কিছু অংশে প্রবেশ নিষিদ্ধ, আবার কিছু এলাকায় নোংরা পানি ও পয়োনিষ্কাশনের সমস্যায় সাঁতার কাটা সম্ভব নয়। ফলে যেসব জায়গা এখনো ব্যবহারযোগ্য, সেগুলোতে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড় জমে।
সন্ধ্যার সময় সৈকতে দেখা যায় শিশুদের খেলাধুলা, বন্ধুদের আড্ডা, ফুটবল খেলা, ছবি তোলা ও ছোট ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক। মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে এটি ভূমধ্যসাগরের অন্য কোনো পর্যটন এলাকা—যতক্ষণ না দূরে নজরে পড়ে যুদ্ধের বাস্তবতা।
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজাবাসী ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত খুঁজে নিচ্ছেন। প্রতিদিনই দেখা যায় বিয়ের শোভাযাত্রা—কখনো গাড়িতে, কখনো ঘোড়ার গাড়িতে।
এক চিকিৎসক বলেন, “যাদের থাকার জায়গা নেই, আয় নেই, তারাও বিয়ে করছেন—এটি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষ হয়তো নিজেদের হারিয়ে যাওয়া আনন্দ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।”
এক বর জানান, তার বিয়েতে আসা অনেক আত্মীয়ই এই যুদ্ধে স্বজন হারিয়েছেন। তাদের জীবনের আনন্দ হারিয়ে গেছে, তাই এই ধরনের আয়োজন কিছু সময়ের জন্য হলেও কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
শিশুদের জন্মদিন উদযাপনও এখন অনেকের কাছে বিশেষ মুহূর্ত। খান ইউনিসের কিছু এলাকায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ভাঙা ভবনের অংশ ব্যবহার করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন।
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও গাজার মানুষ প্রমাণ করছেন—অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষ বেঁচে থাকার জন্য আনন্দের ছোট ছোট জায়গা তৈরি করে নিতে পারে।