উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
একটি ভাইরাল ছবি বদলে দিয়েছিল লামিয়া রাইহানের পরিচয়। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সহপাঠীদের মুক্ত করতে ইডেন মহিলা কলেজের তালাবদ্ধ হল খুলে দেওয়া এই শিক্ষার্থী হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। কিন্তু দুই বছর পর তার অভিযোগ—আন্দোলনের সম্মুখসারির অনেক নারী কর্মীর মতো তাকেও ইতিহাসের মূল বয়ান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলছে অনলাইন হয়রানি ও সামাজিক চাপ।
২০২৪ সালের ১৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম উত্তপ্ত কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ। অভিযোগ ছিল, আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে কলেজের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল। বাইরে অবস্থান নিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বিসিএল) কর্মীরা।
সেই সময় ইডেন মহিলা কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন লামিয়া রাইহান। কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিনি আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে এগিয়ে যান। প্রায় ১২ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মিলে তিনি কলেজের মূল ফটক খুলে দেন এবং ছয়টি আবাসিক হলের তালা ভেঙে শিক্ষার্থীদের বের করে আনেন।
সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সংঘর্ষের সময় লামিয়া রাইহানের পালিয়ে যাওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি তাকে জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখে পরিণত করে। তবে লামিয়ার দাবি, আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে সম্মুখসারির নারী কর্মীরা যথাযথ স্বীকৃতি পাননি।
লামিয়ার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয় ২০২৪ সালের ৭ জুলাই। কোটা সংস্কারের দাবিতে কর্মসূচি জোরালো হওয়ার পর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ইডেন কলেজে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
লামিয়া বলেন, “সকাল ১০টার দিকে আমরা কলেজে জড়ো হয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন গেট বন্ধ করে দিয়েছিল। এর আগে কলেজের পুকুরপাড় এলাকায় ছাত্রলীগের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল এবং আবাসিক হলগুলো তালাবদ্ধ করা হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “আমরা মূল ফটক খুলে ছয়টি হলের তালা ভেঙে শিক্ষার্থীদের মুক্ত করি। এরপর টিএসসির দিকে মিছিল নিয়ে যাই।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লাঠি, রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় প্রায় ৫০ জন নারী শিক্ষার্থী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের পেছনে আটকা পড়েছিলেন।
লামিয়া বলেন, “শিক্ষার্থীদের টেনে বের করে মারধর করা হচ্ছিল। চারদিকে ইট ও ভাঙা কাচ পড়ছিল। ভিড়ের কারণে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না।”
পরে এক সহপাঠীর সহায়তায় তিনি আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। ওই মুহূর্তের ছবি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
লামিয়ার দাবি, ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি নজরদারির মধ্যে পড়েন। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে কোটা ব্যবস্থার বিষয়গুলো বোঝানোর পর তারা তার পাশে থাকলেও ঢাকায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, জুলাইয়ের শেষ দিকে তার আবাসিক এলাকায় মধ্যরাতে অভিযান চালানো শুরু হয়।
লামিয়া বলেন, “রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে অভিযান হতো। আমার ভাইরাল ছবির কারণে পুলিশি হয়রানির আশঙ্কায় বাড়িওয়ালা আমাকে বাসা ছাড়তে বলেন। ২৯ জুলাই আমি বগুড়ায় ফিরে যাই।”
এরপরও তিনি বগুড়ায় আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং আগস্টের শুরু পর্যন্ত বিভিন্ন সমাবেশে যুক্ত ছিলেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নারী অধিকার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করেন লামিয়া।
তিনি বলেন, “নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত। নারী কর্মীরা লক্ষ্য করে সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন।”
আন্দোলন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা বা গণমাধ্যমে কথা বললেই নানা ধরনের আক্রমণের মুখে পড়েন বলে জানান তিনি।
লামিয়ার ভাষায়, “কমেন্ট সেকশনে নারীবিদ্বেষী মন্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকে। এটি আমার পরিবারকেও প্রভাবিত করে। আমার মা পর্যন্ত আমাকে সাক্ষাৎকার না দিতে বলেছেন।”
জুলাই আন্দোলনের পর বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক উদ্যোগ থেকেও যথেষ্ট যোগাযোগ পাননি বলে অভিযোগ করেন লামিয়া।
তিনি বলেন, “দুই বছরে জুলাই আন্দোলনের কোনো সমন্বয়ক, জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো সদস্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।”
তার মতে, যদি আন্দোলনের পরিচিত মুখরাই দুই বছর উপেক্ষিত থাকেন, তাহলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত নারী কর্মীর অবদান আরও বেশি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্য পূরণে ধীরগতির সমালোচনা করেন লামিয়া। বিশেষ করে জুলাই সনদ (July Charter) পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, “সরকার জুলাই সনদের কিছু বিষয় গ্রহণ করেছে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলো উপেক্ষিত রয়েছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তন হতে পারে। যারা জীবন ঝুঁকিতে রেখে আন্দোলন করেছেন, একসময় তাদেরই ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।”