প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন খোরশেদ আলম (ছদ্মনাম)। শুরুতে নিজে জুয়ায় অংশ নিলেও পরে তিনি অনেককে এই অন্ধকার জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, কেউই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হননি। বরং নিজের মতো অনেকেই হারিয়েছেন জীবনের সঞ্চয়।
২৯ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী জানান, জুয়ার অর্থ জোগাড় করতে একসময় পরিবারের জমি ও গয়না পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। তার ভাষায়, সহজে টাকা আয়ের আশায় যারা অনলাইন জুয়ায় প্রবেশ করেন, শেষ পর্যন্ত তাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
তবে সতর্কতার পরও বাংলাদেশে অনলাইন বেটিংয়ের বিস্তার থামছে না। বিশেষ করে চলমান
ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়েছে জুয়ার প্রচারণা। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের কাছে এসব প্ল্যাটফর্ম সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে।
বিশ্বকাপ ঘিরে সক্রিয় জুয়ার প্রচারণা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক লাখের বেশি সদস্য থাকা একাধিক গ্রুপে বিশ্বকাপ ম্যাচকে কেন্দ্র করে নিয়মিত বেটিংয়ের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কয়েকটি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজারের বেশি বলেও জানা গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে অনেক নতুন গ্রুপ খোলা হয়েছে অথবা পুরোনো গ্রুপের নাম পরিবর্তন করে বেটিং প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
দেশে ৫০ লাখের বেশি মানুষ জড়িত থাকার আশঙ্কা
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি মানুষ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত বা এতে আসক্ত। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা। প্রতি বছর এই বাজার ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে।
নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান
অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে সরকার
‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এতে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং, ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে জুয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ধরনের জুয়াকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনে অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ায় জড়িত থাকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বেটিংয়ে অংশগ্রহণ করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
এছাড়া জুয়ার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সহজেই পাওয়া যাচ্ছে বেটিং সাইট
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ বেটিং সাইট এজেন্টভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা বিকল্প লিংকের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সহজেই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন।
অ্যাকাউন্ট খুলতে প্রয়োজন হচ্ছে শুধু একটি মোবাইল নম্বর। এরপর এজেন্টদের মাধ্যমে টাকা জমা ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) যেমন বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এজেন্ট নেটওয়ার্কে চলছে কার্যক্রম
একজন এজেন্টের বরাতে জানা গেছে, দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত এসব প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম চালাতে বিপুল সংখ্যক এজেন্ট কাজ করছেন। তারা ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলনের কাজে সহায়তা করেন।
এজেন্টরা নতুন গ্রাহক সংগ্রহের জন্য কমিশন পেয়ে থাকেন বলেও জানা গেছে।
আইন প্রয়োগে নজরদারি বাড়ানোর দাবি
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় কোনো ক্রীড়া আয়োজন চলাকালে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে অধিকাংশ জুয়ার কার্যক্রম অনলাইনে স্থানান্তরিত হওয়ায় নতুন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য
বিকাশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ আর্থিক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিরোধে তারা নিয়মিত নজরদারি করে থাকে। সন্দেহজনক লেনদেন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা হয়।
নগদের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, কোনো ধরনের অনৈতিক বা অবৈধ লেনদেনের জন্য তাদের সেবা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক ড. দিন এম সুমন রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন বেটিং বন্ধ করতে হলে সরকারকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় করতে হবে।
তার মতে, বাংলাদেশের আইনি অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করলেই হবে না; একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থিক লেনদেন নজরদারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।