উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
“দয়া করে সরকারের সঙ্গে আমাদের হয়ে কথা বলুন। আমাদের জন্য কী করতে পারেন দেখুন”—আকুতি সিরাজগঞ্জের ৩০ বছর বয়সী ডিগ্রি শিক্ষার্থী এনামুল কাওসারের।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হাঁটুর কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি পা হারিয়েছেন কাওসার। তার মতো অনেক আহত ও স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া অভ্যুত্থান-সারভাইভার এখন বলছেন, তাদের লড়াই থামেনি। তবে সেই লড়াই আর গুলির বিরুদ্ধে নয়; বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বেকারত্ব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে।

আন্দোলনের সময় যারা হাত-পা হারিয়েছেন, তাদের অনেকের জন্য গুলির আঘাত থেকে বেঁচে যাওয়াই ছিল কেবল শুরু। বর্তমানে তারা এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরছেন—আবেদন করছেন, অনুমোদনের অপেক্ষা করছেন, পুনর্বিবেচনার আবেদন জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার ঘোষিত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম ধীরগতির, অসম এবং অনেক ক্ষেত্রে এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
কাওসার বর্তমানে সরকারের দেওয়া মাসিক ভাতা পান। তবে তার মতে, এই সহায়তা হারানো স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারছে না।
“আমি এখন আর স্বাভাবিক কাজ করতে পারি না,” বলেন তিনি। শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়বেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো নিশ্চয়তা পাননি।
তার চাওয়া বাড়তি ভাতা নয়, একটি চাকরি।
অনেকের ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুত মৌলিক সহায়তাও এখনো পৌঁছায়নি।
মো. কামরুল হাসান ছিলেন অটোরিকশাচালক। ১৯ জুলাই রামপুরার মেরাদিয়া বাজার এলাকায় গুলিতে তার বাম পা হারান তিনি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন ভাতার তালিকায় নাম ওঠার জন্য।
কামরুল বলেন, “ভাতার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রায় চার মাস আগে সব কাগজ জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো খবর পাইনি।”
যে কাজ করে তিনি সংসার চালাতেন, সেই অটোরিকশা চালানো আর সম্ভব নয়। এখন পুরোপুরি পরিবারের ওপর নির্ভরশীল তিনি।
আহত আন্দোলনকারীদের উদ্ধার করতে গিয়ে একটি হাত হারিয়েছেন আতিউল গাজী। তার অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি প্রাপ্য সহায়তা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “আমি এখন মূলত পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। বসে বসে খাই।”
আতিউলের দাবি, যারা প্রকৃতপক্ষে অঙ্গ হারিয়েছেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বারবার আবেদন করেও তিনি এমন একটি সহায়তা শ্রেণিতে রয়েছেন, যা তার প্রতিবন্ধকতার মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন কাঠামো অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর ও স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকারদের জন্য ‘ক্যাটাগরি এ’ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা এককালীন ৫ লাখ টাকা, মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা, সরকারি হাসপাতালে আজীবন চিকিৎসা এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক পুনর্বাসন সুবিধা পাওয়ার কথা।
‘ক্যাটাগরি বি’তে রয়েছেন গুরুতর আহত কিন্তু তুলনামূলক কম প্রতিবন্ধিতার শিকাররা। আর ‘ক্যাটাগরি সি’তে রয়েছেন যারা চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
আতিউলের অভিযোগ, একটি হাত হারানোর পরও তাকে ‘ক্যাটাগরি সি’-তে রাখা হয়েছে। তার এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারের ঘোষিত শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
তার হতাশা শুধু আর্থিক সহায়তা নিয়ে নয়।
“চাকরি, শিক্ষা সহায়তা—যেসব বিষয় হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোও ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।”
আলাদাভাবে দেখলে এগুলো প্রত্যেকটি মানুষের ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প। কিন্তু সবগুলো ঘটনা একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বড় চিত্র সামনে আসে—গুরুতর আহত অভ্যুত্থান-সারভাইভারদের অনেকেই বলছেন, পুনর্বাসন কার্যক্রম অসম, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত এবং আন্দোলনের পর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব সহায়তায় রূপ নেয়নি।
তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ শুধু অর্থের বিষয় নয়। মাসিক ভাতা হারানো কর্মক্ষমতা, শিক্ষা বা স্বাধীন জীবনযাপনের বিকল্প হতে পারে না। একটি অঙ্গ হারানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কোনো অর্থ দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে যারা স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেঁচে আছেন, তাদের শরীরেই বহন হচ্ছে সেই আন্দোলনের মূল্য। তারা প্রতিদিন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একটি পরিবর্তনের জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছে।
যদি জুলাই অভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকারকারীদের পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই মানুষগুলোকে তাদের ত্যাগের প্রমাণ দিতে মাসের পর মাস অফিসে ঘুরতে হবে না। চাকরি, পুনর্বাসন ও স্বীকৃতির জন্য তাদের আবেদন-নিবেদন করতে হবে না।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে, সেই বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে এসব মানুষের ত্যাগ। তাদের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ নয়, এটি জাতির কাছে তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব।
মূল প্রতিবেদন: সাঈদ হোসেন শান্ত, দ্য ডেল্টাগ্রাম
বাংলা অনুবাদ: দৈনিক টারমিগান ডেস্ক