উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
আফগানিস্তান থেকে তাইওয়ান পর্যন্ত নজিরবিহীন বৃষ্টিপাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব
“১০ দিন ১০ রাত একটানা বৃষ্টি হয়েছে—এমন কিছু আমি আগে কখনো দেখিনি।” আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলের দুর্গম দুরবাবা জেলার নির্মাণশ্রমিক আনর গুল এভাবেই বর্ণনা করেন সাম্প্রতিক ভয়াবহ বৃষ্টিপাতের অভিজ্ঞতা।
পাহাড়ি ওই এলাকার বেশির ভাগ বাড়ি পাথর ও কাদামাটি দিয়ে তৈরি। ফলে প্রবল বৃষ্টিতে এসব ঘর সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে আনর গুলের রান্নাঘর ধসে পড়ে। তার প্রতিবেশী সৈয়দ আফসার সাদাতের বাড়ির বড় একটি অংশও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
সাদাত বলেন, “এ ধরনের বৃষ্টি প্রতি বছর আরও তীব্র হচ্ছে এবং আগেই শুরু হচ্ছে। এগুলো আমাদের রাস্তা ধ্বংস করছে, ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সরাসরি আমাদের জীবনে এর প্রভাব পড়ছে।”
গত সপ্তাহে আফগানিস্তানে প্রবল বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় বহু গ্রাম ও শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অন্তত ৩১ জন নিহত এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন।
শুধু আফগানিস্তান নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টির কারণে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক ভারী বর্ষণ ও বন্যা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, “আমরা সবকিছু হারিয়েছি।”
জুলাইয়ের শুরুতে চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে বাঁশখালী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
জেসমিন জানান, রাতের বন্যায় তাদের হাঁস-মুরগি মারা গেছে, ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে, ঘর ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে থাকা সন্তানদের বই, স্কুলব্যাগ, খেলনা, কাপড় ও রান্নার সামগ্রী—সব নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি ছয় সন্তানকে বুকসমান পানির মধ্য দিয়ে নিয়ে মায়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে এক সপ্তাহের বেশি সময় গাদাগাদি করে থাকতে হয়েছে।
“আমরা সবকিছু হারিয়েছি। খালের পাশে থাকা আমাদের ঘরটি আগে থেকেই ভালো অবস্থায় ছিল না। কয়েক মাস আগে আমরা সেটি মেরামত করেছিলাম। এখন বন্যা আবার সব ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের কোনো টাকা নেই। বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া খাদ্য সহায়তায় বেঁচে আছি,” বলেন তিনি।
পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরে ফিরে গেলেও সন্তানদের ভেজা মেঝেতে প্লাস্টিক বিছিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন জেসমিন। এরই মধ্যে তার এক মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যখন ভয়াবহ দাবানল চলছে, তখন এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত রয়েছে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত।
দক্ষিণ কোরিয়ায় তাপপ্রবাহের পর দেখা দিয়েছে প্রবল বৃষ্টি। জাপান ও ভিয়েতনামে অতিবৃষ্টির কারণে ভূমিধস হয়েছে।
চীনেও এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বন্যা মৌসুমে একাধিক দফায় চরম বৃষ্টিপাত হয়েছে। দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ৬০০টির বেশি নদীর পানি সতর্কতা সীমা অতিক্রম করেছে, যা গত পাঁচ বছরের একই সময়ের গড়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর চংকিংয়ে প্রবল বৃষ্টির পর ভূমিধসে অন্তত ১১ জন নিহত এবং ৫০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। অন্যদিকে, গানসু প্রদেশে আকস্মিক বন্যায় ১০ জন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন।
পরপর কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় এ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
চীনে চলতি বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় নউলের প্রভাবে গুয়াংডং প্রদেশে ৮ লাখ ৯০ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে জুলাইয়ের শুরুতে ঘূর্ণিঝড় মাইসাকের আঘাতে গুয়াংশির বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এতে বাণিজ্যিক সাপের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শত শত সাপ বেরিয়ে যায়।
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, সামনে আরও বৃষ্টিপাত হতে পারে। চীনের উত্তরাঞ্চল, যার মধ্যে বেইজিংও রয়েছে, স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি পেতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় অবস্থিত তাইওয়ানেও চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে।
দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে অতিবৃষ্টির কারণে তাইওয়ানে ৩৩ কোটি তাইওয়ান ডলারের বেশি কৃষি ক্ষতি হয়েছে। রাজধানী তাইপে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়াজুড়ে এসব চরম আবহাওয়ার ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এশিয়ার বড় অংশে তীব্র তাপ, আর্দ্রতা, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) জানিয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়বে এবং হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বরফ গলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।
নাতাশা মে ও জোনাথন ওয়াটস