প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬
ঢাকায় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি, প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি: অনুসন্ধান
ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বড় মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানী ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বছরের পর বছর গবেষণা, পরিকল্পনা ও বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরও ভূমিকম্প মোকাবিলার সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরের অনেক ভবন বড় ভূমিকম্পে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে প্রতি ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর ৭ মাত্রার এবং ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, গত এক শতকে এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সহসভাপতি অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর জানান, আগে ধারণা করা হতো মধুপুর ফল্ট থেকে বড় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে। তবে নরসিংদীর কাছাকাছি এলাকায় হওয়া সাম্প্রতিক ভূমিকম্প দেখিয়েছে, ঢাকার আশপাশের এলাকাতেও বড় ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকার কাছে উৎপত্তি হওয়া ৬ মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কোটি টাকার যন্ত্র পড়ে আছে অব্যবহৃত
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা যাচাইয়ের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’-এর আওতায় আরবান সেফটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট (ইউএসআরআই) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
প্রায় ৫৬৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছে ২৫ ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্র দিয়ে মাটির শক্তি পরীক্ষা, নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই এবং ভবনের কাঠামোর ভেতরের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করা সম্ভব।
কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রপাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান, আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় তিন হাজারের বেশি ভবন পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি চালু হলে আরও অনেক বেশি ভবনের ঝুঁকি যাচাই করা সম্ভব হতো।
অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার পরিকল্পনাহীন সম্প্রসারণ, জলাভূমি ভরাট, নিচু জমিতে ভবন নির্মাণ এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণবিধি না মানার কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেড়েছে।
তাদের মতে, শুধু ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বা গবেষণা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা, জনসচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত মহড়া আয়োজন এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
উদ্ধার প্রস্তুতি থাকলেও প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার জন্য বিভিন্ন উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ উদ্ধারকারী দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং বড় ধরনের দুর্যোগ হলে ঢাকায় অতিরিক্ত উদ্ধারকারী দল মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবভিত্তিক কার্যক্রম। কারণ বড় ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে
প্রকাশক ও সম্পাদক: মিরাজ হোসেন সুজন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।