দেশের মানুষের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা ভোজ্যতেল ও চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক দুটি পৃথক গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, এসব খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে প্রতিদিনই অজান্তে মানবদেহে প্রবেশ করছে অসংখ্য অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি লিটার তেলে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণা রয়েছে। এর মধ্যে খোলা সয়াবিন তেলে দূষণের মাত্রা বোতলজাত তেলের তুলনায় বেশি।
গবেষণাটি চলতি বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত হয়। এতে সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
একই বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় সর্বোচ্চ মাত্রার দূষণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের পাত্র পুনর্ব্যবহার, খোলা অবস্থায় খাদ্য সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত দূষণ এ সমস্যার অন্যতম কারণ। উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও পরিবহন প্রক্রিয়াও সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনার ৯৫ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। ব্র্যান্ডেড চিনির তুলনায় খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত এ গবেষণায় বলা হয়েছে, উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপে এসব কণা খাদ্যে মিশতে পারে।
দুই গবেষণাতেই পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, পিভিসি, নাইলন, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ফাইবার বা আঁশজাতীয় কণা, যা সিনথেটিক পোশাক, প্লাস্টিক সামগ্রী, পাইপ, ফিল্টার, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব কণা শরীরে জমতে থাকলে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, যেসব খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলো বাজারে আসার আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। তাই মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদের মতে, অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রক্তনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া এটি হজমতন্ত্র, ফুসফুস, প্রজনন স্বাস্থ্য ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।