উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
দেশের উচ্চ শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন কলা ও মানবিক বিষয়ে। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক একাডেমিক মান, গবেষণা ও র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে রয়েছে এ খাত। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং সংস্থা কিউএসের ২০২৬ সালের বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়ে কলা ও মানবিক বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩৬২ জন। এর মধ্যে কলা ও মানবিক অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন ১৯ লাখ ৮ হাজার ৮৩৯ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশই এই ধারার বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও কলা ও মানবিক বিষয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৯ হাজার ২১৫ জন এই অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে পড়ছেন।
তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ খাতের দৃশ্যমানতা কম। কিউএস ২০২৬-এর কলা ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়ে বিশ্বের ৫৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকেও বহু বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় থাকলেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিতে পারেনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, কলা ও মানবিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সীমাবদ্ধতা, আধুনিক পাঠ্যক্রমের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কে কম অংশগ্রহণ।
তারা বলছেন, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণার ফলাফল দ্রুত আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের সুযোগ বেশি থাকলেও ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, ভাষা ও সংস্কৃতির মতো মানবিক বিষয়ের গবেষণার ধরন আলাদা। অনেক গবেষণা স্থানীয় বা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটভিত্তিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সময় লাগে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। গবেষণায় বরাদ্দ কম এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনার সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
দেশের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও মানবিক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলেও কিউএসের বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ কলা অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ ছিল কলা অনুষদ। তবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণার ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে মানবিক বিষয়গুলো অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মতো মানবিক গবেষণার মূল্যায়ন সবসময় একই পদ্ধতিতে করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলা ও মানবিক শিক্ষা একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও চিন্তাশক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ খাতকে শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে নয়, গবেষণা ও মানের দিক থেকেও শক্তিশালী করতে হবে।
তাদের পরামর্শ, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধি, শিক্ষকদের গবেষণা দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের কলা ও মানবিক শিক্ষাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, উচ্চ শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার প্রকৃত মানদণ্ড।