শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট : সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

আয়নাঘরের ৭ যমসেল: যেখানে হারিয়ে যেত অসংখ্য মানুষ

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
আয়নাঘরের ৭ যমসেল: যেখানে হারিয়ে যেত অসংখ্য মানুষ
আয়নাঘরের ৭ যমসেল: যেখানে হারিয়ে যেত অসংখ্য মানুষ
0:00 / 0:00
1x

লোহার ভারী দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি পুরোনো দ্বিতল ভবন। বাইরে থেকে সাধারণ সরকারি স্থাপনা মনে হলেও কয়েক কদম এগোতেই মিলিয়ে যায় দিনের আলো। সামনে আসে একের পর এক ছোট, অন্ধকার কক্ষ। কোথাও বাতাস ঢোকে না, কোথাও সূর্যের আলো পৌঁছায় না। মাত্র দুই ফুট চওড়া ও চার ফুট লম্বা এমন সাতটি সংকীর্ণ কক্ষকে বলা হতো ‘যমসেল’।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারকরা শনিবার (১ আগস্ট) র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শনে গিয়ে এসব কক্ষ ঘুরে দেখেন। প্রসিকিউশনের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুমের শিকার ব্যক্তিদের একটি অংশকে এখানে দীর্ঘদিন আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো।

তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরার বিমানবন্দর এলাকায় র‍্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে অস্ত্রাগার-সংলগ্ন পুরোনো ভবনটিই টিএফআই সেল হিসেবে পরিচিত। সাধারণভাবে এটি জিজ্ঞাসাবাদের স্থান হলেও প্রসিকিউশনের ভাষ্য, ২০০৯ সালের পর এটি গোপন বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

২৯টি কক্ষ, সাতটি ‘যমসেল’

ভবনটিতে মোট ২৯টি সেল রয়েছে। নিচতলায় প্রবেশপথের পাশে ছিল সাতটি অতিসংকীর্ণ ‘যমসেল’। এছাড়া নিচতলায় ১০টি এবং দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি সেল রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় দুটি বড় আকারের কক্ষও রয়েছে, যেগুলোকে ‘ভিআইপি সেল’ বলা হতো বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলে করিডোরেও অস্থায়ী পার্টিশন তৈরি করে মানুষকে আটকে রাখা হতো।

সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে নির্যাতনের অভিযোগ

টিএফআই সেলের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তিনটি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার সরঞ্জাম এবং অন্যান্য নির্যাতনের উপকরণ ছিল। এসব ব্যবহার করে বন্দিদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আলামত নষ্টের চেষ্টা?

পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল, রঙের প্রলেপ এবং সংস্কারের চিহ্ন রয়েছে। কয়েকটি কক্ষের প্রবেশপথ ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সম্ভাব্য আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ভবনের বিভিন্ন অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে।

প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে তদন্তকারীরা দেয়াল ভেঙে একাধিক গোপন কক্ষের সন্ধান পান।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিল

প্রসিকিউশনের দাবি, দ্বিতীয় তলার একটি সেলে দীর্ঘদিন গুম থাকা ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেমকে রাখা হয়েছিল। এছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানসহ আরও কয়েকজনকে এখানে আটকে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এসব তথ্য ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে।

‘প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে’

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ট্রাইব্যুনালের বক্তব্য

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তে টিএফআই সেলের প্রকৃত কাঠামো প্রথমে খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছিল। কারণ বিভিন্ন অংশ দেয়াল তুলে আড়াল করা হয়েছিল। পরে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গোপন কক্ষগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, "এই কক্ষগুলো কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে। তদন্ত আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই পরিচালিত হচ্ছে।"

টিএফআই সেলের পরিদর্শনকে চলমান তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে প্রসিকিউশন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি এবং মামলার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
BD-24,.COM

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


আয়নাঘরের ৭ যমসেল: যেখানে হারিয়ে যেত অসংখ্য মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

লোহার ভারী দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি পুরোনো দ্বিতল ভবন। বাইরে থেকে সাধারণ সরকারি স্থাপনা মনে হলেও কয়েক কদম এগোতেই মিলিয়ে যায় দিনের আলো। সামনে আসে একের পর এক ছোট, অন্ধকার কক্ষ। কোথাও বাতাস ঢোকে না, কোথাও সূর্যের আলো পৌঁছায় না। মাত্র দুই ফুট চওড়া ও চার ফুট লম্বা এমন সাতটি সংকীর্ণ কক্ষকে বলা হতো ‘যমসেল’।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারকরা শনিবার (১ আগস্ট) র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শনে গিয়ে এসব কক্ষ ঘুরে দেখেন। প্রসিকিউশনের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুমের শিকার ব্যক্তিদের একটি অংশকে এখানে দীর্ঘদিন আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো।

তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরার বিমানবন্দর এলাকায় র‍্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে অস্ত্রাগার-সংলগ্ন পুরোনো ভবনটিই টিএফআই সেল হিসেবে পরিচিত। সাধারণভাবে এটি জিজ্ঞাসাবাদের স্থান হলেও প্রসিকিউশনের ভাষ্য, ২০০৯ সালের পর এটি গোপন বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

২৯টি কক্ষ, সাতটি ‘যমসেল’

ভবনটিতে মোট ২৯টি সেল রয়েছে। নিচতলায় প্রবেশপথের পাশে ছিল সাতটি অতিসংকীর্ণ ‘যমসেল’। এছাড়া নিচতলায় ১০টি এবং দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি সেল রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় দুটি বড় আকারের কক্ষও রয়েছে, যেগুলোকে ‘ভিআইপি সেল’ বলা হতো বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলে করিডোরেও অস্থায়ী পার্টিশন তৈরি করে মানুষকে আটকে রাখা হতো।

সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে নির্যাতনের অভিযোগ

টিএফআই সেলের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তিনটি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার সরঞ্জাম এবং অন্যান্য নির্যাতনের উপকরণ ছিল। এসব ব্যবহার করে বন্দিদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আলামত নষ্টের চেষ্টা?

পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল, রঙের প্রলেপ এবং সংস্কারের চিহ্ন রয়েছে। কয়েকটি কক্ষের প্রবেশপথ ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সম্ভাব্য আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ভবনের বিভিন্ন অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে।

প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে তদন্তকারীরা দেয়াল ভেঙে একাধিক গোপন কক্ষের সন্ধান পান।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিল

প্রসিকিউশনের দাবি, দ্বিতীয় তলার একটি সেলে দীর্ঘদিন গুম থাকা ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেমকে রাখা হয়েছিল। এছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানসহ আরও কয়েকজনকে এখানে আটকে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এসব তথ্য ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে।

‘প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে’

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ট্রাইব্যুনালের বক্তব্য

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তে টিএফআই সেলের প্রকৃত কাঠামো প্রথমে খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছিল। কারণ বিভিন্ন অংশ দেয়াল তুলে আড়াল করা হয়েছিল। পরে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গোপন কক্ষগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, "এই কক্ষগুলো কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে। তদন্ত আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই পরিচালিত হচ্ছে।"

টিএফআই সেলের পরিদর্শনকে চলমান তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে প্রসিকিউশন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি এবং মামলার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।

BD-24,.COM

সম্পাদক ও প্রকাশক
মিরাজ হোসেন সুজন
মোবাইল: ০১৭৪৭২৪৩৬৩৭

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।